মহাকাব্য মোহাম্মদ' পর্ব ১:

মহাকাব্য মোহাম্মদ'  পর্ব ১:

মহাকাব্য মোহাম্মদ' পর্ব ১:

মহাকাব্য মোহাম্মদ পর্ব ১:

 

রাত্রির গর্ভে যখন আঁধার ঘনীভূত,

মানবতা হারিয়েছিল পথ, আশা, ও প্রতিশ্রুতি।

আরবের বুকে মরুর বাতাস কাঁদছিল

এ এক জনপদ, যেখানে আত্মা ছিল নিষ্প্রাণ।

কন্যা সন্তান জন্ম নিলে মাটির নিচেই শেষ,

নারীর সম্মান ছিল শব্দহীন অভিশাপের মতো।

ভোগই ছিল ধর্ম, গর্বই ছিল ঈশ্বর,

আর সত্যএক তিরস্কারিত ভবিষ্যৎ।

প্রতিটি ঘর পূর্ণ ছিল মূর্তির প্রেতছায়ায়,

কাবা ছিল শুধু পাথরের নির্লজ্জ রাজনীতি।

কৃষ্ণাঙ্গ দাসের কান্না কেউ শুনত না,

ধনী আর দরিদ্রের ফারাক ছিল আকাশ-পাতালের চেয়ে গভীর।

এই পৃথিবীর অন্ধকার গর্ভেই জন্ম নিতে যাচ্ছেন তিনি

আলোকের উত্তরাধিকার, চিরন্তন মানবতার প্রতিনিধি।

৫৭০ খ্রিস্টাব্দ, এক রবিউল আউয়াল,

মক্কার আকাশে নেমে এলো এক নীরব বিস্ময়।

আব্দুল্লাহর অনাথ সন্তান, আমিনার গভীর দৃষ্টিতে

যে শিশু তাকিয়ে ছিল যেন স্বর্গের মুখোমুখি।

মুহাম্মদনামকরণে ছিল ভবিষ্যতের ধ্বনি,

যার অর্থযার প্রশংসা হবে বারবার, যুগে যুগে।

জন্মেই তিনি আলোকিত করলেন ঘর নয়,

পুরো মরুর চেতনা।

বাল্যকাল কেটেছে হালিমা সাদিয়ার ঘরে

যেখানে দুধের সঙ্গে বরকত এসেছিল মরুপ্রান্তরে।

তাঁর উপস্থিতিতে শুকনো জমি হেসেছিল,

মেষ ছিল মোহিত, আর শিশুরা পেয়েছিল আশ্চর্য শান্তি।

তাঁর চোখ ছিল গভীরযেন দূর আকাশের ডাকে সাড়া দেওয়া জোতিষ্ক।

কোনো শৈশব নয়, এই ছিল ভবিষ্যতের প্রস্তুতি।

পিতৃহীন, মাতৃহীনতবু নিঃসঙ্গ নন তিনি,

আল্লাহর ছায়ায় ছিলেন সবসময়।

জীবনের শুরুতে হারানো শোকও ছিল পরিশুদ্ধির রূপ,

যে শোক তাঁকে নির্মাণ করছিল নীরবে।

তিনি বেড়ে উঠেছেন চাচা আবু তালিবের স্নেহে,

যেখানে দায়িত্ব শেখেন, শ্রদ্ধা শেখেন, শ্রমের মহিমা বোঝেন।

তাঁর মুখে এক পবিত্র নীরবতা,

যার গভীরে ছিল এক অনুচ্চারিত মহানবী।

মক্কার প্রতিটি কোণে তিনি হেঁটেছেন

কখনও ব্যবসা, কখনও নিরব প্রতিচিন্তা।

বাল্য বন্ধুদের খেলাধুলার মাঝেও তাঁর ভিন্নতা ছিল স্পষ্ট,

তাঁর হাসি ছিল বিনয়ী, তাঁর কথাবার্তা ছিল পরিমিত।

মরুভূমি জানত নাতাদের মাঝে হাঁটে এমন একজন

যিনি একদিন বদলে দেবেন ইতিহাস।

মানবতার এমন সংজ্ঞা আনবেন

যা হবে সব জাতির সীমানা ছাড়িয়ে।

তাঁর রোজকার কাজ ছিল ক্লান্তিকর,

তবু তিনি অভিযোগ করতেন না

কারণ তাঁর ভিতরে গড়ে উঠছিল এক ঈমান,

এক আত্মবিশ্বাস, যা ছিল ধৈর্য ও দয়ার প্রতিমূর্তি।

তিনি শুধু একজন মানুষ ছিলেন না,

তিনি ছিলেন এক আলোর কণা, যিনি কালে কালে ছড়িয়ে পড়বেন।

যখন বণিক হয়ে পাড়ি জমালেন দূর দেশে,

সকলেই বলল"আল-আমিন যাচ্ছে!"

সততা ছিল তাঁর সবচে বড় পরিচয়,

তাঁর চেহারায় ছিল মাধুর্য, এবং অন্তরে উদারতা।

শুধু ব্যবসা নয়,

তাঁর বাণিজ্য ছিল নীতির, সত্যের, এবং মানবতার প্রচার।

তখন খাদিজামহীয়সী নারী,

তাঁর হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল মুহাম্মদের চরিত্রে।

এক মহৎ মিলন ঘটে,

যেখানে ভালোবাসা ও মর্যাদা একাকার।

দাম্পত্যে সুখ এল, তবু তাঁর চোখে রয়ে গেল এক অন্বেষণ

আমি কে? কোথায় আলোক?”

রাত্রির গভীরে হেরা গুহার প্রাচীরে বসতেন একা,

চুপচাপ, অনুধ্যানমগ্ন, কেবল আত্মা ও আকাশের মাঝে সংলাপ।

বাতাস থেমে যেত যেন তাঁর ধ্যানে,

আর পাহাড় নত হতো তাঁর মৌন প্রার্থনায়।

এই মানুষ একদিন বলবেন

"আমি তোমাদের মাঝে এক দুঃখিত ভ্রাতা মাত্র!"

এই মানুষ একদিন গড়বেন রাষ্ট্র, সমাজ, হৃদয়ের বিপ্লব।

তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবন ছিল প্রস্তুতি

যার গন্তব্য ছিল আসমান।

তিনি জানতেন নাএকটি কণ্ঠস্বর নামবে,

যা বলবে: ইকরাপড়ো, জ্ঞান অর্জন করো।

এখনো সেই দিন আসেনি,

তবে বাতাসে যেন এক ধ্বনি কাঁপছে,

যা বলছে"সময়ের অন্ধকার শেষ হতে চলেছে।"

মানুষের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সত্ত্বা একদিন জাগবে,

আর সেই ডাক আসবে মুহাম্মদের মুখ থেকে।

তাঁর চোখ তখনো দেখেনি জিবরাইলকে,

তাঁর বুক তখনো ফেঁটে ওঠেনি ওহির ভারে।

তবে আল্লাহ তাঁর হৃদয়ে তৈরি করছিলেন জায়গা

ভবিষ্যতের মহা দাওয়াতের।

যা শুধুই আরবের জন্য নয়,

সমগ্র মানবজাতির জন্য এক আলোকমন্ত্র।

এই শুরু, এই ভূমিকা

এক মহাজীবনের প্রারম্ভ বৃত্ত।

এ যেন প্রথম পাতায় লেখা নাম

যার কাহিনি রচিত হবে আসমান-জমিনে।

তিনি তখনো জানতেন না,

তাঁর জীবন হবে শেষ নবীর জীবনী।

তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করবে কোটি কোটি হৃদয়।

তবে তিনি অনুভব করতেন

এক আকুল ডাক, এক অসীম দৃষ্টি তাঁকে দেখছে।

রাত্রির শান্ত নক্ষত্রগুলো যেন তাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় জ্বলত,

তারা জানতএই শিশু মানুষ নয়, সময়ের এক স্বর্ণসূত্র।

তিনি ছিলেন একাকী, তবু ছিলেন পূর্ণ,

তাঁর হৃদয় ছিল আকাশের মতো বিস্তৃত।

মক্কার অলিগলি তাঁকে চিনতো,

এক যুবক, নীরব, কিন্তু মহান কোনো বাণীর বাহক।

তিনি হতেন না তর্কে অংশগ্রহণকারী,

তাঁর নীরবতা ছিল সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ভাষণ।

মানুষ জানতো, যদি আল-আমিন কিছু বলেন

তবে সেটিই হবে শেষ কথা।

তিনি কোনো ধর্ম প্রচার করতেন না,

তবু তাঁর আচরণেই ফুটে উঠত এক অদৃশ্য ধর্মের ছায়া।

পাথরের শহরে যেন এক নরম কুসুম,

যা হাত না ছুঁয়ে মনকে ছুঁয়ে যায়।

তিনি ছিলেন সময়ের আগেই আধুনিক,

তবু অতীতের মতো বিনয়ী, প্রাচীন জ্ঞানের ধারক।

তাঁর প্রতিটি দিনের নিরবতা ছিল এক প্রস্তুতির গান,

যা জাগবে হঠাৎ একদিন, এক ঝড়ের মতো।

হেরা গুহা ছিল তাঁর নিবেদনময় আশ্রম,

যেখানে শব্দহীনতা কথা বলত ঈশ্বরের সঙ্গে।

তাঁর চোখে ছিল প্রশ্নআত্মার, জগতের, মানবতার,

আর উত্তর ছিল আসন্ন এক ওহিতে।

আল্লাহ তখন স্বয়ং তাঁকে গড়ে তুলছেন,

যেন একটি আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হবে সত্যের মুখ।

নদী জানে তার মোহনার দিক,

তেমনই নবী জানতেন না তিনি নবী,

তবু হাঁটছিলেন নবুওতের পথে।

তাঁর প্রতিটি শ্বাসে যেন ছিল দায়িত্ব,

আর প্রতিটি নিঃশ্বাসে ছিল একটি জাতির আশ্রয়।

তিনি কোনো বাহ্যিক রাজা ছিলেন না,

তাঁর রাজত্ব ছিল হৃদয়েরভালোবাসা, সহানুভূতি ও সুবিচারের।

তাঁর মাথায় ছিল না মুকুট,

তবু আকাশ নিজেই ছিল তাঁর ছায়া।

আকাশের মালিকের পক্ষ থেকে আসছিল একটি মিশন,

যা শুরু হবে ইকরাদিয়ে, শেষ হবে বিদায়ের ভাষণে।

তাঁর চোখের গভীরতা কোনো প্রেমিকের নয়,

এ ছিল এক ঈশ্বরীয় ডাকের বেদনা।

একদিন সেই ডাক নামবে

আর থরথরিয়ে কাঁপবে হৃদয়, শরীর, বিশ্বচেতনা।

তাঁর কণ্ঠ তখনো উচ্চারিত হয়নি

তবে সময় জানত, সে কণ্ঠ একদিন পৃথিবী বদলে দেবে।

মৃত্যুর চেয়েও সত্য,

আলোকের চেয়েও স্বচ্ছ হবে তাঁর বাণী।

তিনি কাঁদবেন মানুষের দুঃখে,

হাসবেন শিশুর হাসিতে, লজ্জিত হবেন গরীবের অনাদরে।

তাঁর চোখ দিয়ে বহমান হবে এমন অশ্রু,

যা হবে ইতিহাসের পবিত্রতম স্রোত।

তিনি কখনো মারবেন না

তবু তাঁর দৃষ্টি হবে বিজয়ের চূড়া।

তাঁর হাত কখনো শূন্য থাকবে না,

তবে তাঁর দান হবে আত্মারও ঊর্ধ্বে।

মানবতা যেন হিমালয়ের চূড়া,

আর তিনি হবেন সেই চূড়ার সূর্যোদয়।

ধর্ম হবে তাঁর কাছে অস্তিত্বের এক ব্যাকরণ,

যা শুধু মসজিদের নয়মাঠ, ঘর, বাজারেরও।

শ্রেণি, বর্ণ, জাতি সব ধুয়ে যাবে তাঁর পায়ে,

কারণ তিনি হবেন শুধু একজন নয়, সবার জন্য।

তিনি যে আসছেনতা শুধু একটি আগমনের নয়,

এ এক বিপ্লবের সূচনা।

তাঁর আগমনে কেঁপে উঠবে মিথ্যা,

ভেঙে যাবে লোভের প্রাসাদ, উঠবে ন্যায়পরায়ণতার পতাকা।

বৃক্ষের পাতাও হয়তো জানত

তাঁর পদধ্বনি বদলে দেবে মৌসুম।

জীবন হবে তাঁর কাছে কুরআনের আয়াত,

আর মৃত্যুআল্লাহর আলিঙ্গন।

মায়া, প্রেম, দয়া, ক্ষোভ, প্রতিবাদসব হবে এক পাত্রে

যার নাম: মুহাম্মদ।

তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ হবে না শুধু ওহির ভারে,

বরং মানবতার কান্নাতেও।

একদিন তিনি বলবেন

তোমাদের কেউ ততক্ষণ ঈমানদার নয়,

যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা চায়,

যা সে চায় নিজের জন্য।

এ এক নবীন দর্শন,

যা বদলে দেবে ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা, নারী-পুরুষের সংজ্ঞা।

তাঁর প্রতিটি কথা হবে আগুনের মতো জ্বলন্ত,

তবু ঠাণ্ডা করে দেবে ঘৃণার তাপ।

কাবা, মদিনা, হেরাসব মিলিয়ে হবে

এক আলোকের মানচিত্র।

তাঁর জন্ম নয়, তাঁর পথ চলাই হবে ইতিহাস,

কারণ তা হবে আল্লাহর লিখিত চিত্রনাট্য।

তিনি বলবেন না "আমি",

বলবেন আমরামানবতা তাঁর ভাষা।

আরব হবে তাঁর সূচনা,

তবে তাঁর শেষ গন্তব্য হবে হৃদয়।

ভবিষ্যৎ তাঁকে চিনবে শুধু নাম দিয়ে নয়,

চরিত্র দিয়ে, চোখ দিয়ে, নীতিতে।

তিনি লিখবেন না কোনো কিতাব,

তবু কিতাব হবে তাঁর হৃদয়ের আয়না।

কুরআন তাঁকে নাজিল হবে,

তবে তা হবে জীবনের পরিপূর্ণতা।

এই মহামানব এখনো জন্ম নিচ্ছেন ইতিহাসের পৃষ্ঠায়,

প্রতি নিঃশ্বাসে, যেখানে রয়েছে পবিত্রতা।

এই ছিল তাঁর আগমন,

আলো হয়ে আসার সূচনা।

এখনো তাঁর মুখ থেকে বলেনি কোনো ওহি,

তবু আকাশ ইতিমধ্যে প্রস্তুত করছে তার ফেরেশতাকে।

হেরা অপেক্ষা করছে এক কাঁপনময় সাক্ষাতের,

যেখানে মুহাম্মদ হবেন নবী,

আর মানবতা পাবে দিকদর্শন।

এক নব যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে

যেখানে একজন মানুষই হবে পুরো ইতিহাসের রূপান্তর।