মুক্তির গান'
মুক্তির গান'
মুক্তির গান'
শান্ত সুনিবিড় ছিল যে মাটি একদিন,
সবুজ প্রান্তরে ঢেউ খেলত সীমাহীন।
সোনারোদে হাসতো ধানের শীষ দলে দলে,
শিশুর কলহাস্য ভাসতো গাঁয়ের জলে।
নদীর কূলে ছিল রূপালি মাছের ঝাঁক,
কোকিলের কুহুতানে ভরে যেত ফাঁকা বাঁক।
প্রকৃতি ছিল সখী, উদার, স্নেহময়ী,
মাটির গন্ধ ছিল যেন নতুন জীবনদায়ী।
এখানেই স্বপ্ন বুনেছিল কত শত প্রাণ,
ভালোবাসা দিয়ে গড়া ছিল মানুষের ঘ্রাণ।
সেদিন ছিল না কোনো ভেদাভেদ, রেষারেষি,
ছিল শুধু একতার বাঁধনে বেড়ে ওঠা বেশি।
কৃষকের লাঙলে ফুটতো আশার চারা,
শ্রমিকের ঘামে ভিজতো সোনালী পথ ধারা।
শিক্ষার আলোয় আলোকিত ছিল প্রতিটি ঘর,
জ্ঞানের পিপাসা মিটতো না কোনো অবসর।
মানুষ মানুষের পাশে ছিল অকৃত্রিম সঙ্গী,
সুখ-দুঃখ ভাগ করে কাটতো দিন সঙ্গী।
প্রাণের উচ্ছ্বাস ছিল প্রতিটি নিশ্বাসে,
মুগ্ধ চোখে দেখতাম প্রভাত আর দিবসে।
বিলের বুকে খেলতো কত শাপলা শালুক,
ভোরবেলা কানে আসতো পাখির মধুর ডাক।
নির্মল বাতাসে ছিল শান্তির সুবাস,
গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছিল না সংশয় বা ত্রাস।
প্রতিটি উঠোনে জ্বলতো সন্ধ্যাপ্রদীপ শান্ত,
মানুষের মনে ছিল না কোনো অশান্তি বা ভ্রান্ত।
তারপর, ধীরে ধীরে, কোথা থেকে এলো ছায়া?
নিঃশব্দে নামলো এক স্বার্থান্ধ মায়া।
লোভের থাবা বাড়ালো ক্ষমতালোভী হাত,
ভেঙে দিল সেই শান্তির স্বপ্নিল বরাত।
অচেনা আঁধারে ঢেকে গেল সেই ভোর,
মুক্তির শৃঙ্খলে হলো মানুষের ঘোর।
কৃষকের বুকে আজ জমে আছে শুধু জ্বালা,
শ্রমিকের রক্তে ভেজে মালিকের কঙ্কাল।
শিক্ষার আলো আজ শুধুই এক পণ্যের নাম,
স্বাস্থ্যসেবা কেবল ধনীকের ধামের সুনাম।
ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা আজ বড্ড হেলে,
গরিবের কান্নার শব্দ ওঠে না কোনো মেলায়।
বঞ্চিতের আর্তনাদ চাপা পড়ে দেয়ালের নিচে,
শোষকের হাসি বাজে উচ্চ অট্টালিকা পিছে।
প্রতিবাদের ভাষা আজ হয় রুদ্ধ, হয় স্তব্ধ,
ভয়ের চাদরে মোড়ানো প্রতিটি শব্দ।
সংবাদপত্রের পাতা আঁকে মিথ্যের রেখা,
সত্য লুকানো থাকে, যায় না তাকে দেখা।
ক্ষমতার মসনদে বসেছে আজ অশুভ দল,
জনগণের রায় আজ শোষকের ছল।
যে গণতন্ত্রের নামে চলে এত প্রহসন,
সেখানে কেবল চলে বঞ্চনার আয়োজন।
বাক স্বাধীনতা আজো খোঁজে আলিঙ্গন,
মিথ্যে আশ্বাসে ঢাকে সত্যের ক্রন্দন।
আইনের চোখে দেখি শুধু ধনীকের দৃষ্টি,
গরিবের আর্তনাদ শোনে না কো সৃষ্টি।
পুলিশের লাঠিতে ভাঙে নিরীহের হাড়,
প্রতিবাদের মিছিলে নামে অত্যাচারের পাহাড়।
জেলে ভরে রাখে সব সত্যের সৈনিক,
মিথ্যের বেড়াজালে বাঁধে স্বপ্ন আনায়িক।
দুর্নীতি আজ জাতির রক্তে মিশে গেছে,
প্রত্যেক স্তরে স্তরে এর বিস্তার পেয়েছে।
মেধাবী তরুণ কেন আজ দিশেহারা?
কর্মসংস্থানের নামে চলে প্রতারণা ধারা।
মধ্যবিত্তের স্বপ্ন কেন হয় ধূলিসাৎ?
আর্থিক সংকটে আজ কাটে দিনরাত।
মানুষ আজ পণ্য, জীবন আজ খেলা,
শোষকের রাজত্বে কাটে প্রতিটি বেলা।
সবুজ প্রকৃতি আজ লুটেরাদের গ্রাসে,
নদী মরে, বন পোড়ে, বিষাক্ত বাতাসে।
কারখানার ধোঁয়ায় আকাশ কালো হয়,
পরিবেশের ভারসাম্য ভেঙে আজ ক্ষয়।
পাহাড় কাটা হয়, নদীপথ বন্ধ,
জীববৈচিত্র্য আজ বিপন্ন, আজ বন্ধ।
জলবায়ু পরিবর্তন, প্রলয়ংকরী ঝড়,
প্রকৃতির প্রতিশোধে কাঁপে আজ ধর।
তবুও থামে না সেই ধ্বংসের অভিলাষ,
অর্থের লোভে চলে প্রকৃতির সর্বনাশ।
সাগরের বুক চিরে গড়ে ওঠে প্রাচীর,
মরে যায় কতশত প্রাণের আধার।
বিশুদ্ধ জলের অভাব, বিশুদ্ধ বাতাসেরও,
মানুষের জীবনে আজ নেমে আসে আঁধার।
আমাদেরই হাতে গড়া এই সর্বনাশের পথ,
অন্ধের মতো ছুটে চলেছি এই রথ।
ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠে বারে বারে,
যুদ্ধ আসে, শান্তি হারায়, রক্তে মাখামাখি করে।
জাতিতে জাতিতে বিভেদ, ধর্মের নামে হানাহানি,
নিহত শিশুর মুখ দেখে চোখ কেন হয় না পানি?
যুদ্ধবাজদের জিঘাংসা আজ চরম সীমায়,
অস্ত্রের ঝনঝনানি বাজে আকাশে, ভূমায়।
নিরীহ মানুষের ভিটেমাটি হয় উচ্ছেদ,
শরণার্থীর সারি বাড়ে, বাড়ে ভেদাভেদ।
শান্তির পায়রা আজ খাঁচাবন্দী যেন,
মুক্তির আকাঙ্ক্ষা শুধু কাঁদে কেন?
কার স্বার্থে এই যুদ্ধ, কার স্বার্থে এই ধ্বংস?
মানবতার কঙ্কাল আজ শুধুই যে অংশ।
বারুদের গন্ধে ভারী বাতাস বিষময়,
স্বপ্নগুলো পুড়ে ছাই হয়, হয় পরাজয়।
আকাশে ওড়ে যুদ্ধবিমানের ডানা,
পৃথিবীর বুকে শুধু বিভীষিকার আনাগোনা।
তবুও থামি না, থামতে জানে না মানব প্রাণ,
আঁধারের শেষেও জাগে আশার আহ্বান।
ভেঙে দাও যত আছে শৃঙ্খল-প্রাচীর,
জেগে ওঠো হে মানব, নির্ভীক, অকুতোভয় বীর!
মুক্ত করো আজ এই পরাধীন ধরণী,
অবিচারের বুকে জ্বালো বিদ্রোহ বহ্নি।
এক হয়ে রুখে দাঁড়াও অন্যায়ের বিরুদ্ধে,
নতুন দিনের সূর্য উঠবেই স্ব-ভূমে।
প্রতিবাদের অগ্নিশিখা জ্বলে প্রতিটি প্রাণে,
শক্তির সঞ্চার হোক প্রতিটি মনে।
আর নয় চুপ থাকা, আর নয় সহন,
অবিচারের বিরুদ্ধে আজ হোক এ গর্জন।
আঁধারের যবনিকা ছিঁড়ে দাও হে তরুণ,
মিথ্যের প্রাসাদ ভাঙো, সত্য করো উন্মোচন।
সংহতির বজ্রমুষ্টি করো আজ ধারণ,
ন্যায্য অধিকারের দাবিতে ওঠো শাণিত রণ।
ভবিষ্যৎ গড়ার শপথ নাও হাতে হাত ধরে,
অমরত্ব লিখো ইতিহাসে, প্রতিবাদের তরে।
এসো গাই জীবনের জয়গান, মুক্তির সুর,
প্রতিবাদের ঝড়ে ভাঙি সব অন্ধকার দূর।
আলো আসবেই, আসবেই মুক্তির দিন,
মানবতার জয় হবে, হবে পরাজয়হীন।
